অস্তিত্বে অনীহা- পর্ব-১

ধারাবাহিক গল্প
আলী বাহার ট্রি স্টেটের মাঝখান দিয়ে একটি আধাপাকা রাস্তা শহরের দিকে চলে গেছে।রাস্তার দু’ পাশে অসংখ্য চা পাতার গাছ যেন অর্ভ্যথনা জানাতে দাঁড়িয়ে থাকে।সতেজ সবুজের বিশালতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাগানের চতুর্দিকে।আবির বেড়ে ওঠেছে এই বাগানের আকাশ,বায়ু,জল গাছগাছালির স্পর্শে। শহরের স্বনামধন্য কলেজে ভর্তি হবে, এই ভাবনাটা তার জন্য অনেক আনন্দের হলেও চিরচেনা পরিবেশ ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়মিত কষ্ট দিবে নতুন জায়গায় টিকে থাকতে।
আবিরের কাকা আবার ঢাকায় সরকারি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। তিনিই প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করেন শহরের কলেজে পড়ার ব্যাপারে। আবির যে বড় হয়ে গেছে সুচিত্রা মানতে নারাজ।সর্বদা ছেলের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার বিপক্ষে। ছেলের এসএসসি পরীক্ষায় সবসময় তার সাথে গিয়ে পরীক্ষা শেষ হলে নিয়ে আসতেন।বিয়ের দশ বছর পর আবির তার গর্ভে আসে।আবিরের বাবা সুবিনয় রায় বাগানের সেকেন্ড ম্যানেজার। একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ।প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলাটা পছন্দ করেন না।আবিরের বাইরে পড়ালেখার জন্য তার সদিচ্ছা সবসময় ছিল।রাতে খাবার শেষ করে সুবিনয় নিজের ঘরে শুয়ে আছেন।
সুচিত্রা অশ্রুসিক্ত হয়ে বললেন,ঢাকায় যাওয়া কি খুব বেশি জরুরী?মেধা পরিপূর্ণ বিকাশ কি গ্রামের আবহাওয়ায় হয় না? সুবিনয় খানিকক্ষণ চুপ ছিলেন।মেধার বিকাশ সব জায়গায় হয় তবে সেটাকে ধাঁরালো করার জন্য বড় পরিসরে যাওয়া উচিত।বড় প্রতিযোগীতায় টিকতে হলে বড় শহরে যেতে হবে। কারণ দেশের সবচেয়ে ভালো মেধাবীদের সম্মেলন ঘটে এই জায়গায়,তিনি বললেন।তারপরেও সুচিত্রা কথাগুলো অত্যধিক স্নেহের কারণে মানতে নারাজ।এই বাগানের মধ্যে থেকে আবির প্রথম বাইরে পড়তে যাচ্ছে।বাগানের প্রথম ম্যানেজার নিরঞ্জন বাবু অত্যন্ত খুশি খবরটা শুনে।
কেউ ভালো কিছু করছে শুনলে অনুপ্রেরণা দিতে কার্পণ্য করেন না। আবিরকে কিছু ঢাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন এবং ভালো ফলাফল লাভ জন্য দিকনির্দেশনা দিলেন।আগামী শুক্রবারে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সুনীল ভোরে ট্রেনযোগে সিলেট আসছে।সুনীল নিজের ছেলের মতোই আবিরকে ভালবাসে।জন্মের পর বেশিরভাগ সময়ই সুনীল তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।আবিরের যখন দশ বছর তিনি ঢাকায় চলে গেলেন।প্রত্যেক বার বাড়িতে আসার সময় তার জন্য নতুন জামাকাপড় নিয়ে আসেন। নতুন পোশাক পেয়ে আবিরের আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই,এক ধরণের নীরবতা চেহারাতে।
সুনীল সবকিছু বুঝেও কিছু বললো না। দূপুর বেলায় একসাথে খাওয়ায় বসে সুনীলের সাথে সুবিনয় ভর্তি ও লেখাপড়ার খরচ সম্বন্ধে কথাবার্তা বললেন।সুনীল লক্ষ্য করলো আবির ভাতে হাত না দিয়ে বসে আছে। আমরা যখন ছোট ছিলাম,তখন ভাবতাম আমরা যেটা ভাবছি সেটাই ঠিক অন্যদের সিদ্ধান্তগুলো ভূল কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়সে আবেগের ছায়াতলে বাস্তবতা ঢাকা পড়ে,সুনীল বললো।বৃহস্পতিবার রাতে মনখারাপ করে সুচিত্রা ছেলের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ব্যাগে ঘুছিয়ে রাখলেন।
রাতে ঘুমানোর আগে বুকভরা কষ্ট নিয়ে ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,আমি কখনো তোমাকে চোখের আড়াল করিনি।আগামীকাল তুমি বিদ্যার্জন করতে এক অপরিচিত শহরে যাবে।তুমি এমন কিছু করবে না যাতে আমরা কষ্ট পাই। মায়ের মুখে এরকম কথা শুনে আবিরের চোখে জলাসিক্ত।সে মাকে জড়িয়ে ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে লাগলো। সুচিত্রার চোখেও অঝোর ধারায় শ্রাবণ নেমে আসলো।
সকাল ৮ টায় ট্রেন ছাড়বে। সুচিত্রা খুব ভোরেই ঘুম থেকে ছেলের মঙ্গলের জন্য পূজা অর্চনা করলেন।তারপর হালকা কিছু নাস্তা বানিয়ে নিজের হাতে আবিরকে খাইয়ে দিলেন।বিদায় জানানোর জন্য স্টেশনে একত্রে সবাই আসলেন।কিছুক্ষণ পর ট্রেন ধীরে ধীরে ছুটলো গন্তব্যের দিকে।আবির জানলার বাইরে মাথা বের করে অবাক দৃষ্টিয়ে তাকিয়ে। সুচিত্রার চোখে সমগ্র বর্ষা একসাথে জড়ো হয়ে নিরন্তর পড়তে লাগলো।কিছু চলে যাওয়া উন্নতির জন্য হলেও মন থেকে বিদায় বলা কঠিন।
বিকেল তিনটায় ট্রেন এসে কমলাপুর থামলো। আবির চেহারায় মনখারাপের মাঝেও দীর্ঘ যাত্রায় মলিনতার ছাপ। তারপর সিএনজি যোগে সুনীল ধানমন্ডিতে পৌছিলেন। বাসাটা তেমন বড় নয়।কিন্তু ভাড়াটা বেতনের এক তৃতীয়াংশ। নিজের হাতেই রান্না করা, কাপড় ধোয়া সবকিছুই করতে হয়।বড় শহরে বাঁচতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অর্থের অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলতে হয়। পরের দিন আবিরকে নটরডেম কলেজে ভর্তি করিয়ে সুনীল তাকে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে শহর সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা দিলেন।
আবির লক্ষ্য করলো,তার ফেলে আসা শহরের সঙ্গে এর কোন মিল নেই।সবাই নিজেকে নিয়ে এতো ব্যস্ত যে আশেপাশে কোন কিছু ঘটলে কেউ ফিরেও তাকায় না।তার কাছে শহরটা এক প্রাণহীন নীরস আবাসস্থল। সে সুনীলকে বলল,কাকা এই যান্ত্রিকতায় মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকে? মানুষ এমন প্রাণী যে পাত্রে রাখা হয়,তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।এখনকার প্রত্যেকটি মানুষ কাজের মধ্যে বেঁচে থাকে।কেউ অলসভাবে সময় কাটায় না, প্রত্যেকে তার উদ্দেশ্যের জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে,উত্তরে সুনীল। তাহলে সব সম্পর্কই কি দেয়া নেয়াতে? পেশাগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এরূপ বেশি লক্ষণীয়। তবে নিজস্ব স্বার্থকে এখানের মানুষ বেশি গুরুত্ব দেয়।তাই সর্তক হয়ে চলাফেরা করা বুদ্ধিমানের কাজ,আবার সুনীল বললো। এতো ধোঁয়া, যানযটের পরেও কোন কোন স্থানে লেক ও সবুজ পার্ক দেখে আবিরের মনে কিছুটা স্বস্তি পেল।
চলবে…
লেখকঃ সুজিত কুমার দাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *