অস্তিত্বে অনিহা- পর্ব-২

ধারাবাহিক গল্প
কলেজে যথারীতি ক্লাস আটটায় শুরু হয়।তাই প্রথম দিন আবির ছোট কাকার সাথে কলেজে আসল।নতুন পরিবেশ ও নতুন মুখের সংস্পর্শে আসলে শুরুরদিকে একটু আধটু অস্বস্তি লাগে।আজ ওরিয়েন্টেশন ক্লাস, সবাই সবার পরিচিত হচ্ছে। আবিরের লক্ষ্য করল, ক্লাসের অন্যদের চেয়ে ফাহিম অন্যরকম।খুব শান্তশিষ্ট,পড়া ব্যতীত অন্যকিছু আলোচনা সে আগ্রহী না। ক্লাসের প্রথম সারির বেঞ্চে অন্য কেউ বসতে না।তাই এই বেঞ্চ আবির,ফাহিম, রুদ্র ও আকাশের জন্য বরাদ্দ ছিল।আকাশ অত্যন্ত ভালো ছাত্র, সে এসএসসি পরীক্ষায় প্রত্যেকটি বিষয়ে নব্বইয়ের অধিক নম্বর পেয়েছে। রুদ্র যদিও ভালো ছাত্র,কিন্তু সে গ্রন্থকিট।এই বয়সেই সে শেকসপিয়ার,শেলী,তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথের মতো অনেকের বই পড়ে নিয়েছে।কলেজের মধ্যে পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আব্দুল্লাহ স্যারকে আবিরের অনেক ভালো লাগে। স্যার যখন কাউকে ডাকেন তখন নামের শেষে বাবা শব্দটা জুড়ে দেন।এতো সহজ করে প্রত্যেকটি বিষয় বুঝিয়ে দেন যে বাসায় দ্বিতীয় বার কাউকে পড়তে হয় না। বছর যেতে না যেতেই প্রথম পর্বের পরীক্ষা তারিখ ঘোষণা হয়েছে।বড় সিলেবাসের জন্য তেমন ভালো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি।তাই আবির একরকমভাবে প্রস্তুতি নিয়ে তেমন ভালো ফলাফল করতে পারেনি।এটা কেবল আবিরের বেলায় হয়নি প্রত্যেকের একই অবস্থা।
ফাহিম তো এ রেজাল্ট দেখে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে।ভালো ছাত্ররা প্রত্যাশার চেয়ে কম পেলে হতাশায় ভোগে।গ্রীষ্মের ছুটিতে কলেজ প্রায় এক মাসের জন্য বন্ধ।বন্ধুদের সবাই গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছে,কেউ কেউ এ ছুটিতে কোথায় না গিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জন্য ভালো ফলের আশায় পুরোদমে নিজেদের তৈরি করছে। আবিরের প্রায় প্রতিদিন তার মায়ের সাথে কথা হয়। সুচিত্রা এ ছুটিতে বাড়ি আসার কথা বললে, সে অসম্মতি জানায়। পূজার ছুটিতে আসবে বলে কথা দেয়।সুনীল কিছুদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসলেন,তখন সে তার সাথে যায়নি।মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে হাতিরঝিল গিয়ে সারাদিন আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যায় আসতো। এই এক বছরে আবিরের বাহ্যিক ও মানসিকভাবে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। নিকোটিনের স্পর্শে ঠোঁট হচ্ছে কালো।গাল জুড়ে ছোট ছোট দাঁড়ি গজিয়েছে, চুলগুলো সমান্তরাল না হয়ে দেখতে ছোট বড় ঘাসের মতো।
প্রায় এক মাস পর কলেজ আবার শুরু হয়েছ।বিজ্ঞানের বিভাগের ছাত্রদের ব্যস্ততা অনেক বেশি।ক্লাস শেষে আবার প্রাইভেট স্যারের কাছে পড়তে হয়।অনেক সময় আবিরের বাসায় আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।সুনীল লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব সচেতন।নিয়মিত কলেজে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসেন।সুনীলের বন্ধু সমর, কলেজে বাংলার শিক্ষক।চাকরি যোগদানের পূর্বে তারা একসাথে থাকতেন। বাংলাতে তার অগাধ পান্ডিত্য।বর্তমানে তার লেখা কয়েকটি উপন্যাসও বের হয়ে।পাঠক মহলে সমাদৃত হয়েছে ব্যাপকভাবে। সমর আবির সম্পর্কে অনেক প্রশংসা করেছে।ক্ল্যাসে মনোযোগী,হোম ট্যাস্ক নিয়মিত করে আনে।সর্বতোভাবে লেখাপড়ার প্রতি খুবই আন্তরিক।সুনীল মনে মনে ভাবতে লাগলেন,এতোদূরে নিয়ে এসে ভূল করেননি।রুদ্র ও আকাশ একই মেসে থাকে।প্রতি শুক্রবারে কাকাকে বলে আবির ওদের কাছে চলে যায়। সকাল থেকে বিকেল অব্দি বিভিন্ন কথার ফাঁকে ফাঁকে ঠোঁটে সিগারেট চেপে চলে বাকবিতন্ডা। প্রেমের প্রতি আকাশের ঝোঁক রয়েছে।তাই সে রুদ্রকে জিজ্ঞেস করল,প্রেম কি স্পর্শের বাইরে?প্রেম হলো ধ্রুবতারা,তুমি দেখতে পারবে কিন্তু স্পর্শ করতে পারবে না।খুঁজতে গেলে নিজেই নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।একমত হতে পারলাম না,আবির বলল।প্রেম হলো সূর্যের আলো,তোমাকে প্রখর তেজে উত্তেজিত করে পশ্চিমে ডুবে যায়।আবিরের কাছ থেকে এরকম কথা শুনে দুজনেই বিস্ময়ে হতবাক।আকাশ বলল,সাহিত্য পাঠ ছাড়া তো ভাই এই ধরণের বাক্য মুখে আসার কথা না।কাকা প্রচুর বই পড়ে,একাডেমিকের বাইরে মাঝে মধ্যে চোখ রাখি বাংলা সাহিত্যে।
এদিকে আবার পূজা চলে আসছে।কলেজ বন্ধ থাকবে দশ দিন।পূজায় বাড়িতে গেলে পড়াশুনায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটবে। ছুটির পর পরেই পরীক্ষা শুরু হবে।এর আগেই নিজেকে পরীক্ষায় জন্য ভালোভাবে তৈরি করতে হবে।তাই শুক্রবার আড্ডাতে না গিয়ে বইয়ের সাথেই কাটে।কয়েকদিন পর পর সুবিনয় আবিরের সাথে মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলে কিভাবে ভালো ফলাফল করা যায় এ ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে থাকেন। পূজার ছুটিতে অনেকদিন পর আবির বাড়ি যাবে বলে ভালো লাগছে কিন্তু উচ্ছ্বাস নেই।বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেনের ফার্স ক্লাস সিটের টিকিট কাটা হল।সুনীল বললেন, দিনে যাওয়ার চেয়ে আশ্বিনের রাতে যাওয়াই ভালো,একটু ঠান্ডা আমেজ থাকে।আবিরও একমত হল। রাত দশটায় ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।সময়ের আগেই এসে তারা নিজের সিটে বসলো। কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছুটলো গন্তব্যের দিকে। সকাল সাতটায় বাড়ি ফিরলেন।প্রথমে সুচিত্রা আবিরকে দেখে চিনতে পারেন নাই।এক বছরের শারীরিক দেখে পরিবর্তন অবাক হলেন।জড়িয়ে ধরে বললেন,তোর এ কি অবস্থা হয়েছে!চেহারাতে ছোট বয়সেই বয়স্ক মানুষের চিহ্ন। মায়েদের মনটা এমনি হয়।একবেলা না খেলে আরেক বেলা বেশি করে পরিপূর্ণ করে দেন।
বাংলোর পাশে বড় মাঠে প্রতিবারের মতো এবার বড়সড় প্যান্ডেলে পূজা হচ্ছে।গ্রামের ছোট ছোট ছেলেরা আবিরকে আদর্শ হিসেবে মেনে হয়। কেউ কেউ ঢাকা শহর সম্বন্ধে জানতে চায়।অনেকেই পরামর্শ নেয় কিভাবে ভালো করে নিজেদের তৈরী করবে ভবিষ্যতের জন্য।আবির মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় আসলে বড় ম্যানেজার নিরঞ্জন বাবুকে প্রণাম করে বললো, জ্যাঠু কেমন আছেন?ভালোই, তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে? তুমি আমাদের বাগানের গর্ব, ভালো রেজাল্ট করে নিজেকে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যাও,নিরঞ্জন বাবু বললেন। আর্শীবাদ করবেন জ্যাঠু।আবির আমার বাংলোতে এসো,তোমার জ্যাঠাই মা তোমার কথা প্রায়ই বলে।এখন না জ্যাঠু,পরে আসবো,আবির বললো।পূজোর চারদিন আবির মাত্র দু’বার বাড়ি থেকে বের হয়েছে।
প্রতিবেশীর কারো বাড়িতে যায় নি।আজকাল আর আগেকার মতো আবির চা বাগানে ছুটে যায় না।কুলী কামীনদের চা গাছের যে প্রতি নিবিড় পরিচর্যা তা দেখার ইচ্ছেই জাগে মনেতে।এক সময় সে কচি পাতার গন্ধ দু হাতের তালুতে মেখে আনন্দ পেত।ছোট পুকুরের ঘোলা পানিতে প্রখর রোদেও শীতল প্রেমে আবিষ্ট হতো।খোলা আকাশের মুক্ত পরিবেশে শুয়ে বিশুদ্ধ বাতাসকে ডেকে নিত নাকের কাছে। এখন তার সবকিছুকে বেমানান মনে হয়।ধোঁয়াশা ভরা নগরীর অলিগলি তার কাছে নতুন ভালোলাগার অনুভূতি।হট্টগোল ও যানযটে যে বিরক্তবোধ ছিল,তা কত সহজে মানিয়ে নিয়েছে।মানুষ বড় হয়ে গেলে পুরানো অস্তিত্বে ভালবাসা থাকে না,থাকে শুধু একরাশ অনীহা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *